ভেনিজুয়েলার জ্বালানি খাতে পুনরায় প্রবেশের প্রস্তুতি বৈশ্বিক জায়ান্টগুলোর

একসময় বিদেশী কোম্পানি ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ফুলেফেঁপে উঠেছিল ভেনিজুয়েলার জ্বালানি তেল উত্তোলন খাত।

একসময় বিদেশী কোম্পানি ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ফুলেফেঁপে উঠেছিল ভেনিজুয়েলার জ্বালানি তেল উত্তোলন খাত। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তা অনেকটাই কমে এসেছে। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ ও চলতি শতকের শুরুর কয়েক বছর দেশটি নিয়মিতভাবে দৈনিক ৩০ লাখ ব্যারেলের বেশি জ্বালানি তেল উত্তোলন করেছে। কিন্তু গত বছর তা নেমে আসে ১০-১২ লাখ ব্যারেলে। কয়েক দশক ধরে দেশটির বিপুল জ্বালানি সম্পদের ভাগ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে ভূরাজনীতি, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও বিদেশী কোম্পানির স্বার্থ। ভেনিজুয়েলার জ্বালানি খাত থেকে বিপুল মুনাফা তুলে নিয়ে পরে এসব কোম্পানি একসময় দেশটি থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেয়। দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ঘাটতি, বিদেশে সম্পদ জব্দ, রফতানিতে বাধা, রাষ্ট্রীয় জ্বালানি তেল কোম্পানি পিডিভিএসএর কার্যক্রমে ভাটা এবং ভেনিজুয়েলার বাণিজ্য ও অর্থায়ন ক্ষমতার ওপর আরোপিত ব্যাপক মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দেশটির জ্বালানি খাতকে মারাত্মক চাপে ফেলে দেয়।

বর্তমানে মার্কিন কোম্পানিগুলোর মধ্যে একমাত্র শেভরনই ভেনিজুয়েলায় সক্রিয়। দেশটির জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় বিদেশী অংশীদার হিসেবে দেখা হয় কোম্পানিটিকে। কোম্পানিটির মাধ্যমেই ভেনিজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেল রফতানি হয়। যদিও ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রীয় বাজেটে যুক্ত করার পরিবর্তে এ আয়ের বৃহদাংশ ব্যবহার হয় শেভরনের পাওনা পরিশোধে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ভেনিজুয়েলার মোট উত্তোলনে শেভরনের হিস্যা ছিল ২০-৩০ শতাংশ।

তবে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ এবং নিকোলাস মাদুরোর অপহরণের পর ভেনিজুয়েলার জ্বালানি তেল উত্তোলন খাত নিয়ে বিদেশী কোম্পানিগুলোর অবস্থানে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। জ্বালানি তেল উত্তোলন খাতের বৈশ্বিক জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এখন আবার ভেনিজুয়েলা নিয়ে তৎপরতা বাড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যেসব সম্পদের ওপর তাদের আধিপত্য ছিল, সেগুলোয় পুনরায় প্রবেশাধিকার ফিরে পাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে কোম্পানিগুলো। ভেনিজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপ এবং মাদুরোকে অপহরণের পর পশ্চিমা কোম্পানিগুলোকে দেশটিতে পুনরায় বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে তুর্কি সংবাদ সংস্থা আনাদোলু জানিয়েছে, এতে সাড়া দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি তেল খাতের জায়ান্টরা আবারো মার্কিন সমর্থিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার অধীনে দেশটিতে পুনরায় প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মধ্যে এক্সনমোবিল ও কনোকোফিলিপসের মতো কোম্পানিগুলো নতুন অংশীদারত্ব, বিশেষ সুবিধা বা উত্তোলন সুবিধা পাওয়ার মাধ্যমে ভেনিজুয়েলার সঙ্গে বিদ্যমান সালিশি দাবিগুলো মীমাংসার চেষ্টা চালাতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আর বিদ্যমান অংশীদারদের মধ্যে শেভরন ভেনিজুয়েলায় আগ্রাসীভাবে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শেভরনের সাবেক শীর্ষ নির্বাহী আলি মোশিরির বরাত দিয়ে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, ট্রাম্পের ‘বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার’ বিনিয়োগের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ভেনিজুয়েলায় প্রায় ২ বিলিয়ন (২০০ কোটি) ডলারের বিনিয়োগ নিয়ে আসতে পারে কোম্পানিটি।

শুধু মার্কিন নয়, টোটালএনার্জিস, ইকুইনর, এনি, বিপি ও শেলের মতো ইউরোপীয় জায়ান্টগুলোও ভেনিজুয়েলায় ফিরতে পারে। যদিও অতীতে দেশটি থেকে তাদের প্রস্থান খুব একটা মসৃণ ছিল না। অনিষ্পন্ন অনেক বিরোধও রয়ে গেছে।

তবে এবার এসব কোম্পানি ভেনিজুয়েলায় পুনরায় প্রবেশের আগে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য শক্ত আইনি নিশ্চয়তা দাবি করছে। এক্ষেত্রে ভেনিজুয়েলার সার্বভৌমত্ব, পরিবেশ সুরক্ষা ও জনকল্যাণের নিশ্চয়তার বিষয়গুলো উপেক্ষিত থেকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।

বর্তমান বিনিয়োগ কাঠামো অনুযায়ী, ভেনিজুয়েলায় জ্বালানি তেল খাতের বিদেশী কোম্পানিগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত নিয়ন্ত্রক সংস্থা পিডিভিএসএর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের ভিত্তিতে সেখানে অংশীদার হিসেবে কাজ করে। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ে বড় হিস্যাটি থাকে পিডিভিএসএর। এখন মার্কিন কোম্পানিগুলোর মধ্যে একমাত্র শেভরনই ভেনিজুয়েলায় সক্রিয় আছে। দেশটির জ্বালানি খাতে আরেক বড় অংশীদার চীনের সিএনপিসি। এর পর রয়েছে স্পেনের রেপসোল। তবে গত বছর যুক্তরাষ্ট্র সরকার ভেনিজুয়েলায় কোম্পানিটির কাজের লাইসেন্স বাতিল করে। রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও ভেনিজুয়েলার বিভিন্ন প্রকল্পে যুক্ত।

অতীতে জ্বালানি উত্তোলন খাতের যেসব বিদেশী জায়ান্ট ভেনিজুয়েলা ছেড়ে গিয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সনমবিল ও কনোকোফিলিপস ছাড়াও রয়েছে ফ্রান্সের টোটালএনার্জিস, নরওয়ের ইকুইনর, ইতালির এনি ও জাপানের ইনপেক্স। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, অবকাঠামোর অবনতি ও ভেনিজুয়েলা সরকারের কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানিগুলো দেশটি ছেড়ে যায়। এর আগে দেশটি থেকে বিপুল পরিমাণ মুনাফা তুলে নেয় কোম্পানিগুলো। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে গৃহীত প্রাকৃতিক গ্যাস প্রকল্পগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের লাইসেন্স বাতিলের ঘোষণার কারণে ভেস্তে গিয়েছিল।

গোটা বিশ্বে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত মজুদ রয়েছে ভেনিজুয়েলায়, যার পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার ৩০০ কোটি ব্যারেল।

নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নেয়ার পর ভেনিজুয়েলার ‘দায়িত্ব’ যুক্তরাষ্ট্র নিচ্ছে বলে ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘মার্কিন বড় জ্বালানি তেল কোম্পানিগুলো ভেনিজুয়েলায় যাবে, অবকাঠামো ঠিক করবে ও বিনিয়োগ করবে। আমরা কিছুই বিনিয়োগ করব না। শুধু দেশটা দেখভাল করব।’

এ বক্তব্য সমালোচকদের দীর্ঘদিনের অভিযোগকে আরো জোরালো করেছে। তারা বলে আসছিলেন, মূলত ভেনিজুয়েলার মূল্যবান সম্পদের ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য নিষেধাজ্ঞা, বিচ্ছিন্নতা এবং এখন সরাসরি সামরিক শক্তি ব্যবহার হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের একটি অংশ বলছেন, অন্য কোনো সময়ে ট্রাম্পের এমন হস্তক্ষেপ হয়তো তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করত। কিন্তু বর্তমানে লাতিন আমেরিকাজুড়ে ডানপন্থী রাজনীতির উত্থানের প্রেক্ষাপটে প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে ‘মৃদুই থেকে গেছে’।

তবে মার্কিন কোম্পানিগুলোর আগ্রহকে বর্তমানে এ মজুদ বা শুধু ভেনিজুয়েলাকেন্দ্রিক ভাবা ঠিক হবে না বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকদের অনেকেই। যুক্তরাষ্ট্রের গোটা লাতিন আমেরিকাকেন্দ্রিক মার্কিন বাজারনীতিতে দেশটি বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করতে যাচ্ছে বলে অভিমত তাদের।

বিশ্লেষকরা বলছেন, লাতিন আমেরিকাকে একটি সামগ্রিক ব্লক হিসেবে দেখার প্রবণতার মধ্য দিয়েই ভেনিজুয়েলায় বিনিয়োগ বাড়ানোর সাম্প্রতিক আগ্রহকে ব্যাখ্যা করা যায়। এখানে রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো প্রায়ই একে অন্যকে শক্তিশালী করে।

(আনাদোলু ও রয়টার্স অবলম্বনে)

আরও